রবিবার-২৯শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি-১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যে শিক্ষা শিক্ষিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে

যে শিক্ষা শিক্ষিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে

যে শিক্ষা শিক্ষিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে

ডা. ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

উপেক্ষিত হচ্ছে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য

শিক্ষার মূল লক্ষ্যটি স্রেফ স্বাক্ষর-জ্ঞান, ভাষাজ্ঞান বা পড়ালেখার সামর্থ্য বৃদ্ধি নয়। নিছক তথ্য ও তত্ত্ব জানানোও নয়। এমন কি বিজ্ঞান বা কারিগরি জ্ঞানে দক্ষ করাও নয়। বরং সে মূল উদ্দেশ্যটি হলো ব্যক্তির ঘুমন্ত বিবেককে জাগ্রত করা। তাকে মানবিক গুণে প্রকৃত মানুষ রূপে বেড়ে উঠতে সাহায্য করা। তখন ব্যক্তির বিশ্বাস, দর্শন ও রুচীবোধই শুধু পাল্টে যায় না, পাল্টে যায় তার কর্মকান্ড, আচার-আচরণ ও চিরায়ত অভ্যাস। তখন বাড়ে সত্যকে মিথ্যা থেকে আলাদা করার সামর্থ্য। অসভ্য ও অসুন্দর মানুষ থেকে শিক্ষিত মানুষ তখন ভিন্নতর মানুষে পরিণত হয়। শিক্ষার মাধ্যমে জাতি এভাবেই পায় পরিশীলিত, সভ্য ও সুন্দর চরিত্রের মানুষ। কিন্তু বাংলাদেশ তা পায়নি। বাংলাদেশের এ বিশাল ব্যর্থতাটি স্রেফ মিথ্যাপূর্ণ গলাবাজি করে ঢাকা যায় না। সে ব্যর্থতার প্রমাণ তো হলো, দেশজুড়ে সন্ত্রাস, খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি, অরাজকতা, স্বৈরচারীদের দখলদারি ও দুর্নীতিতে বিশ্বে বার বার প্রথম স্থান অর্জন। এসব ব্যর্থতার কারণ অনেক। তবে মূল ব্যর্থতাটি শিক্ষাব্যবস্থার। গরু-ছাগল বেড়ে ওঠে গোয়ালে, এবং মানব শিশু মানবিক গুণে বেড়ে ওঠে বিদ্যালেয়। বাংলাদেশের ব্যর্থতাগুলি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা জাতিকে শিক্ষিত করতে এবং ছাত্রদের প্রকৃত মানব রূপে গড়ে তুলতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। এ শিক্ষা শুধু দুর্নীতি, সন্ত্রাস, স্বৈরচারই বাড়ায়নি, বাড়িয়েছে পরনির্ভরতাও। মেরুদণ্ড গড়ার বদলে সেটিকে বরং চূর্ণ বা পঙ্গু করছে। ব্যক্তির নিজেকে ও তার প্রভুকে জানতেও এটি তেমন সাহায্য করছে না।

শিক্ষার মূল লক্ষ্য, কোনটি সত্য ও কোনটি মিথ্যা এবং কোনটি জান্নাতের পথ আর কোনটি জাহান্নামের পথ সেটি জানায় ছাত্রের সামর্থ্য বাড়ানো। সেটি না হলে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি শয়তানের শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়। তখন ছাত্রগণ কর্মজীবনে ডাক্তার, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, প্রকৌশলী, প্রশাসক বা বিচারক হয়েও মিথ্যার জোয়ারে ভাসতে থাকে ও শয়তানের সেপাহীতে পরিণত হয়। এমন দেশে ভিনদেশী শত্রুগণও তাদের পক্ষে বিপুল সংখ্যক ভাড়াটে সৈনিক পায়। বিশ্ববিদ্যালের সেরা ডিগ্রি নিয়েও এমন ব্যক্তি নিরেট জাহেল, ইসলামের শত্রু ও জাহান্নামের যাত্রীতে পরিণত হয়। ইসলামের বিজয় রুখতে তারা আন্তর্জাতিক কাফিরশক্তির সাথেও কোয়ালিশন গড়ে। ইসলামে জাহেল থাকাটিই এজন্যই কবীরা গুনাহ। সকল গুনাহর এটিই হলো জননী। তাই অজ্ঞতা নিয়ে অসম্ভব হয় সত্যিকার মুসলিম হওয়া। তাই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী কোন ব্যক্তি যখন সেক্যুলারিস্ট, জাতীয়তাবাদী বা সমাজবাদী রাজনীতির ক্যাডার বা সমর্থক হয় তখন কি বুঝতে বাকি যে ব্যর্থতাটি এখানে শিক্ষালাভে?

জীবনে কাজের সংখ্যা অসংখ্য। তবে সফল হতে হলে অধীক গুরুত্বপূর্ণ সে হুশটি ষোল আনা থাকতে হয়। সে বোধ থাকলে গাড়ির গায়ে রঙ লাগানোর চেয়ে তার ইঞ্জিন ঠিক করাটি অধীক গুরুত্বপূর্ণ গণ্য হয়। নইলে সে গাড়ি চলে না। ইসলামের সে ইঞ্জিনটি হলো ঈমান। সে ঈমান পানাহারে বেড়ে ওঠে না, তা যত পুষ্টিকরই হোক। ঈমান বেড়ে হয় এবং পুষ্টি পায় পবিত্র কুরআন-হাদীসের জ্ঞানে। তাই ইসলামে ফরযকৃত প্রথম ইবাদতটি নামায-রোযা বা হজ-যাকাত নয়। সেটি হলো জ্ঞানার্জন। সঠিক ও শক্তিশালী ইঞ্জিনের সাথে যেটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক পথের তথা সিরাতুল মুস্তাকীমের রোডম্যাপ। পবিত্র কুরআন হলো সে রোড ম্যাপ। পবিত্র কুরআনের জ্ঞান ছাড়া কোন ব্যক্তির নিজের বুদ্ধিতে, তা সে যতবড় বুদ্ধিমানই হোক না কেন, জান্নাতের পাওয়া সম্ভব। সেটি এমনকি নবীজী (সা.)-এর পক্ষে সম্ভব ছিল না।

سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْاَعْلَىۙ۰۰۱ (পড় যিনি সৃষ্টি করেছেন সে মহান প্রভুর নামে)[1], পবিত্র কুরআনে ঘোষিত মহান আল্লাহর এ প্রথম আয়াতটি এবং প্রথম এ হুকুমটি মূলত সে অপরিহার্য বিষয়টিই সুস্পষ্ট করে। এবং সে নির্দেশটি স্রেফ নবীজী (সা.)-এর প্রতি নয়, বরং প্রতিটি মানুষের ওপর। যার মাঝে সে জ্ঞানার্জনের হুকুম পালনে আগ্রহ নাই সে ব্যক্তি নামাযী, রোযাদার বা হাজী হতে পারে; কিন্তু যেরূপ জ্ঞানবান মুসলিম মহান আল্লাহ তাআলার কাছে পছন্দীয় সে পর্যায় পৌঁছা কি তার পক্ষে সম্ভব?

যে ব্যক্তি পবিত্র কুরআনের সে জ্ঞান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল, সে ব্যক্তি তো নিরেট জাহেল। এমন জাহেলগণ মুসলিম হওয়ার পরিবর্তে কাফের, মুনাফিক, ও জালেম হয়; পরকালে এরাই অনন্ত কালের জন্য জাহান্নামের বাসিন্দা হয়। জ্ঞানার্জন ছাড়া ঈমান-আকিদা যেমন ঠিক হয় না, তেমনি অন্য ইবাদতও সঠিক হয় না। কুরআনী ইলমে সত্যিকার জ্ঞানবান ব্যক্তিকে ইসলামে আলেম বলা হয়, এবং সেজন্য মাদরাসার ডিগ্রি জরুরি নয়। সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে আজ অবধি মুসলিম ইতিহাসে যারা শ্রেষ্ঠ আলেম রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন তাদের কারোই এমন ডিগ্রি ছিল না। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দিয়েছেন,

اِنَّمَا يَخْشَى اللّٰهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمٰٓؤُاؕ ۰۰۲۸

‘মানবসৃষ্টির মাঝে একমাত্র আলেমগণই আল্লাহকে ভয় করে।[2]

এর অর্থ দাঁড়ায়, নিজ মনে আল্লাহ তাআলার ভয় সৃষ্টি করতে হলে তাকে আলেম হতে হয়। প্রশ্ন হলো, আল্লাহ তাআলার ভয় ছাড়া কি প্রকৃত মুসলিম হওয়া যায়? মুসলিম হতে হলে তাই আলেমও হতে হয়। সে জন্য জ্ঞানার্জন অপরিহার্য। এবং সে জ্ঞানের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও সর্বশ্রেষ্ঠ ভাণ্ডারটি হলো পবিত্র কুরআন। এটিই মানব জাতির জন্য মহান আল্লাহ তাআলার সর্বশ্রেষ্ঠ দান; তেল, গ্যাস বা সোনা-রূপা নয়। কুরআনের জ্ঞান ছাড়া তাই প্রকৃত জ্ঞানী হওয়া চেষ্টা হতে বাধ্য। অথচ বাংলাদেশে জ্ঞানী হওয়ার কাজটি হয়েছে কুরআনের জ্ঞান ছাড়াই। এতে দেশে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও ডিগ্রিধারীদের সংখ্যা বিপুল সংখ্যায় বেড়েছে, কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানী বা আলেম বাড়েনি। বরং ভয়ানকভাবে যা বেড়েছে তা হলো খুনি, ধর্ষক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের সংখ্যা।

পালিত হচ্ছে না জ্ঞানার্জনের ফরয

খাওয়ার অর্থ কোন কিছু শুধু মুখে পুরা নয়, বরং সেটি চর্বন করা, গলধঃকরণ করা এবং হজম করা। নইলে সেটি খাওয়া হয়না, এবং তাতে দেহের পুষ্টিও বাড়ে না। বরং তাতে খাদ্যের অপচয় হয়। খাওয়ার টেবিলে বসে কোন শিশু সেটি করলে সে শিশুর পিতা তাতে খুশি হয় না। তেমনি পড়ার অর্থ শুধু তিলাওয়াত নয়, বরং যা পড়া হয় তার অর্থ পুরাপুরি বোঝা। অথচ বাংলাদেশে কুরআন পড়ার নামে স্রেফ তিলাওয়াত হয়, কুরআন বোঝা হয় না। কুরআনী জ্ঞানার্জনের ফরযও এতে আদায় হয় না। অথচ পবিত্র কুরআনে اَفَلَا يَتَدَبَّرُوْنَ الْقُرْاٰنَؕ ۰۰۸۲ (তোমার কোন গভীরভাবে মননিবেশ করো না?)[3] এবং اَفَلَا تَعْقِلُوْنَ۰۰۴۴ (তোমার কেন নিজের বিবেক-বু্‌দি্ধকে কাজে লাগানো না?)[4] এরূপ প্রশ্ন রেখে মহান আল্লাহ তাআলা মূলত পবিত্র কুরআন বোঝার ওপর অপরিসীম গুরুত্ব দিয়েছেন। নবীর যুগে সাহাবাগণ সেটি বুঝেছিলেন। তাই সে সময় যারা নিরক্ষর ছিলেন বা ভেড়া চড়াতে তারাও দ্রুততার সাথে অতি উচ্চমানের জ্ঞানী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। অথচ বিস্ময়ের বিষয় হলো, বাংলাদেশের আলেমগণ এরূপ অর্থ না বুঝে যারা স্রেফ তিলাওয়াত করে তাদের কাজকে নিন্দা করেন না। বরং সেটিকে সওয়াবের কাজ বলে প্রশংসা করেন। ফরযে আইন পালনের বদলে স্রেফ সওয়াব হাসিলই তাদের কাছে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশে কুরআন তিলাওয়াতের আয়োজন বিপুলভাবে বেড়েছে কিন্তু কুরআন বোঝার আয়োজন বাড়েনি।

অথচ না বুঝে নিছক তিলাওয়াতের যে নফল সওয়াব সেটি হাসিল না করলে কারো গুনাহ হয় না। তাছাড়া মাথা টানলে যেমন কান এমনিতেই আসে, বুঝে কুরআন পাঠ করলে তিলাওয়াতের সওয়াব তো সে সাথে জুটতোই। কিন্তু কুরআন না বুঝলে মহান আল্লাহ তাআলার হুকুমের যে চরম অবাধ্যতা হয় এবং তাতে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা যে সম্ভব হয় না, সে হুশ কি তাদের আছে? মহান আল্লাহ তাআলার হুকুমের প্রতিটি অবাধ্যতাই তো কুফরি। পবিত্র কুরআনের অর্থ বোঝা যে কতটা জরুরি সেটি বোঝা যায় মহান আল্লাহ তাআলার এ মহান আল্লাহ তাআলার পবিত্র ঘোষণা:

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَقْرَبُوا الصَّلٰوةَ وَاَنْتُمْ سُكٰرٰى حَتّٰى تَعْلَمُوْا مَا تَقُوْلُوْنَ ؕ ۰۰۴۳

‘হে ঈমানদারগণ! তোমার নামাযের নিকটবর্তী হয়ো না যদি মদ্যপ অবস্থায় থাকো এবং ততক্ষণ পর্যন্ত নয় যতক্ষণ না তোমরা যা বলো তা বুঝতে না পারো।[5]

আয়াতটি যখন নাযিল হয়েছিল তখনও মদ্যপান হারাম ঘোষিত হয়নি। ফলে অনেকে মদ্যপ অবস্থায় নামাযে দাঁড়াতো। কিন্তু তার ফলে নামাযে দাঁড়িয়ে মুখে যে আয়াতগুলো তাঁরা তিলাওয়াত করতো তাঁর অর্থ তাঁরা বুঝতো না। মহান আল্লাহ তাআলার কাছে সেটি আদৌ পছন্দনীয় হয়নি। তিনি চান না যে, কেউ তাঁর নাযিলকৃত পবিত্র কুরআন পাঠ করবে অথচ তার অর্থ বুঝবে না। এটি মদ্যপ অবস্থাতেই সম্ভব। তবে আরেকটি কারণেও সেটি সম্ভব সেটি হলো না বুঝে কুরআন তিলাওয়াতে। তাই ইসলামে মদ্যপান যেমন হারাম ঘোষিত হয়েছে, তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পবিত্র কুরআন বুঝে তিলাওয়াতের ওপর। কুরআন বোঝার সে গুরুত্বটি বোঝার কারণেই প্রাথমিক যুগের অনারব মুসলিমগন নিজেদের মাতৃভাষা পরিহার করে আরবি ভাষাকে গ্রহণ করেছিলেন। অর্থ উদ্ধারে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই পবিত্র কুরআনের বার বার খতম তিলাওয়াত সত্ত্বেও বাঙালি মুসলিমদের জ্ঞানের ভূবনে কোন বৃদ্ধি ঘটছে না। লক্ষ লক্ষ ঘন্টা এভাবে ব্যয় হলেও তাতে প্রকৃত জ্ঞানী তথা সত্যিকারের আলেম সৃষ্টি হচ্ছে না। আলেম সৃষ্টি হলে তো ইসলামের বিজয়ে মুজাহিদও সৃষ্টি হতো। তখন আল্লাহর নির্দেশিত শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠাও ঘটতো। পবিত্র কুরআন না বোঝার কারণেই মুসলিম দেশগুলিতে আল্লাহ-ভীরু প্রকৃত মুসলিম সৃষ্টি হচ্ছে না। শিক্ষার ময়দানে বাঙালী মুসলিমদের জীবনে এটিই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। সে ব্যর্থতার কারণে দ্রুত বাড়ছে জাহেলদের সংখ্যা। ফলে বাড়ছে ১৬ কোটি মুসলিমের দেশে ইসলামের পরাজয়। এবং বলবান হচ্ছে ইসলামের শত্রুপক্ষের প্রবল অধিকৃতি।

শিক্ষার মাধ্যমেই ছাত্র-ছাত্রীদের জীবনে প্রতিদিন ভ্যালু এ্যাড বা মূল্য সংযোজন হয়। মানব জীবনে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো এরূপ লাগতর মূল্য সংযোজন। রাষ্ট্রের এবং মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো এটি। ভূমি, কৃষিপণ্য, খনিজ সম্পদের গায়ে মূল্য সংযোজনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মহান আল্লাহ তাআলার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির গায়ে মূল্য সংযোজন। তবে মানবজীবনে সবচেয়ে বড় মূল্য-সংযোজনটি হলো হিদায়েত বা সিরাতুল মুস্তাকীম-প্রাপ্তি। মানব-জীবনের সাথে সেটি যুক্ত না হলে ব্যক্তি ও সমষ্টির সকল খাত ব্যর্থ হতে বাধ্য। তখন ব্যর্থ হয় প্রশাসন, রাজনীতি, প্রতিরক্ষা, আইন-আদালত, শিল্প, কৃষি, বিজ্ঞানসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য খাত। মূল্য সংযোজনের অর্থ, ব্যক্তির জীবনে লাগাতর জ্ঞান, প্রজ্ঞা, চারিত্রিক পরিশুদ্ধি ও কর্ম-কুশলতা বৃদ্ধি।

মুমিনের জীবনে শিক্ষাকালটি স্কুল-কলেজের শিক্ষা শেষ হওয়ায় শেষ হয় না। বরং আজীবন সে ছাত্র এবং তার জ্ঞানার্জন চলে কবরে যাওয়ার পূর্ব-মুহূর্ত পর্যন্ত। তাই নবীজী (সা.) বলেছেন, তার জন্য ধ্বংস যার জীবনে পর পর দুটি দিন এলো অথচ তার জ্ঞানে বৃদ্ধি ঘটলো না। ঈমানদার ব্যক্তিকে তাই রাতে বিছানায় যাওয়ার আগে ভাবতে হয়, তার জ্ঞানের ভূবনে সে দিনে কতটুকু অর্জন হলো তা নিয়ে। পাটের আঁশে মূল্য সংযোজন না হলে সেটি স্রেফ আঁশই থেকে যায়। বাজারে তার মূল্য সামান্যই। মূল্য সংযোজন হলে সে পাটের আঁশই মূল্যবান কার্পেটে পরিণত হয়। মূল্য সংযোজনের ফলে খনির স্বর্ণ পরিণত হয় অতি মূল্যবান গহনাতে। মানব জীবনে মূল্য সংযোজনের সে ইন্ডাস্ট্রিগুলো হলো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও মসজিদ-মাদরাসা। কিন্তু বাংলাদেশে সবচেয়ে ব্যর্থ খাত হল এগুলি। এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে হচ্ছে এর উল্টোটি।

শিক্ষাঙ্গণ যেখানে ক্রাইম ইন্ডাস্ট্রি

বাংলাদেশকে যারা সন্ত্রাসী, স্বৈরচারী, ও দুর্নীতিবাজদের দেশে পরিণত করেছে তারা কোন ডাকাত পাড়ায় বেড়ে ওঠেনি। তারা শিক্ষা পেয়েছে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। নবীজী (সা.)-এর বিখ্যাত হাদীস: ‘প্রতিটি শিশুর জন্ম হয় মুসলিম হিসেবে।

তাই মুসলিম দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত কাজ হলো, প্রতিটি শিশুর জীবনে কুরআনের জ্ঞানের সাহায্যে যথাযথ মূল্য সংযোজন ঘটিয়ে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠতে সাহায্য করা। এভাবেই মুসলিম দেশের ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি ছাত্রদের সাহায্য করে জান্নাতে পৌঁছতে। কিন্তু কাফের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এজেন্ডাটি হয় উল্টোটি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তখন ব্যবহৃত হয় ছাত্রদের ইসলাম থেকে দূরে সরানো ও ইসলামের শত্রু তৈরির কাজে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালের ডিগ্রিধারী ছাত্রগণ যখন সন্ত্রাসী, খুনি, ঘুষখোর, ধর্ষক, মাদকাসক্ত এবং রাজনীতিতে নাস্তিক, জাতিয়তাবাদী, সমাজবাদী ও সেক্যিলারিস্ট রাজনীতির ক্যাডার ও ইসলামের শত্রু রূপে খাড়া হয়, তখন কি বুঝতে বাকি থাকে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি কিসের ইন্ডাস্ট্রি এগুলোর কারণে মুসলিম শিশু ডিগ্রি পাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এসব ডিগ্রিধারিগণই বাংলাদেশকে বার বার পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে।

প্রতিটি ব্যক্তির গভীরে যে সম্পদ লুকিয়ে আছে তা সোনার খনির বা তেলের খনির চেয়েও হাজরো গুণ সমৃদ্ধ। শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠায় এবং উন্নততর সভ্যতার নির্মাণে বস্তুত এ মানবিক সম্পদই মূল। অন্যসব সম্পদের প্রাচুর্য আসে এ সম্পদের ভিত্তিতেই। তাই উন্নত জাতিসমূহ শুধু মাটি বা সাগরের তলাতেই অনুসন্ধান করে না, বরং মানুষের গভীরেও আবিস্কারে হাত দেয়। মানুষের নিজ শক্তি আবিস্কৃত না হলে প্রাকৃতিক শক্তিতে তেমন কল্যাণ আসে না। তাই আফ্রিকার সোনার খনি বা আরবদের তেলের খনি সে এলাকার মানুষকে উপহার দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শোষন ও মানবেতর স্বৈরচার| অথচ নবী পাক (সা.) মানুষকে সভ্যতর কাজে ও সভ্যতার নির্মানে ব্যক্তির সুপ্ত শক্তির আবিস্কারে হাত দিয়েছিলেন। ফলে মানব-ইতিহাসের বিস্ময়কর মানুষে পরিণত হয়েছিলেন সাহাবায়ে কেরাম। ফেরেশতাদের চেয়েও তারা উঁচুতে উঠতে পেরেছিলেন। তবে বীজ থেকে অঙ্কুরোদগমের জন্য চাই উপযুক্ত মাটি, পানি ও জলবায়ু। নইলে তা থেকে চারা গজায় না, বৃক্ষও বেড়ে ওঠে না। তেমনি ব্যক্তির সুপ্ত শক্তি ও সামর্থের বেড়ে উঠার জন্যও চাই উপযুক্ত পরিবেশ। সেরূপ একটি পরিবেশ দিয়ে সাহায্য করাই বিদ্যালয়ের মূল কাজ। তখন জেগে ওঠে ব্যক্তির ঘুমন্ত বিবেক। বেড়ে ওঠে তার ব্যক্তিত্ব। বিদ্যালয়ে এ কাজ না হলে তখন দেহ হত্যা না হলেও নিহত হয় শিশুর সুপ্ত সৃষ্টিশীল সামর্থ। তখন বিদ্যালয় পরিণত হয় বিবেকের বধ্যশালায়। তখন মানুষ পরিণত হয় নিজেই নিজের বিবেক ও প্রতিভার কবরস্থানে।

বাংলাদেশের বিদ্যালয়ে এভাবেই খুন হচ্ছে বহু খালেদ, তারেক, ইবনে সিনা, ফারাবী, তারাবীর ন্যায় প্রতিভা। তবে বিপদ শুধু প্রতিভার হত্যাকাণ্ডতেই সীমাবদ্ধ নয়। জমিতে ফসল না ফলালে যেমন বিপদ বাড়ে আগাছার তান্ডবে, তেমনি সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বের আবাদ না বাড়ালে সেখানে বেড়ে ওঠে দুর্বৃত্তরা। বাংলাদেশে সেটিই হয়েছে অতি ব্যাপকভাবে। দেশেটির আজকের বিপদের মূল হেতু এখানেই। এরা যে শুধু পতিতা পল্লি, জোয়ার আসর ও ড্রাগের বাবসা দখলে নিয়েছে তাই নয়, রাজনীতি, অফিস আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলির ওপরও আধিপত্য জমিয়েছে। নিছক রাস্তার চোর-ডাকাত বা সন্ত্রাসীদের কারণে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হয়নি। বরং সে উপাধিটি জুটেছে দেশের সর্বস্তরে দুর্বৃত্তদের দখলদারি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে।

পশু থেকে মানুষ পৃথক তার চেতনার কারণে। এ চেতনা দেয় চিন্তা-ভাবনার সামর্থ। এবং এ চিন্তা-ভাবনা থেকেই ব্যক্তি পায় সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় এবং ধর্ম-অধর্ম বেছে চলার যোগ্যতা। মহৎ মানুষ রূপে বেড়ে উঠার জন্য এটি এতই গুরুত্বপুর্ণ যে পবিত্র কুরআনে বারবার বলা হয়েছে, اَفَلَا تَعْقِلُوْنَ۰۰۴۴, اَفَلَا يَتَدَبَّرُوْنَ ؕ ۰۰۸۲ ও اَفَلَا تَتَفَكَّرُوْنَؒ۰۰۵۰ বলে। ‘তোমরা কেন চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগাও না?’[6] ‘তোমরা কেন ধ্যানমগ্ন হও না?’[7], ‘তোমরা কেন ভাবনা?’[8] সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক গুণ তাই দৈহিক বল নয় বরং তার চিন্তাভাবনার সামর্থ্য। চিন্তার সামর্থ্য অর্জিত হলে নিজেকে শিক্ষিত করার কাজে সে শুধু সুশীল ছাত্র হিসেবেই বেড়ে ওঠে না, নিজেই নিজের শিক্ষকে পরিণত হয়। এমন ব্যক্তির জীবনে শেখা এবং শেখানো এ দুটোই তখন সমানে এগুয়। ঈমানদার তাই সর্বাবস্থাতেই যেমন ছাত্র, তেমনি শিক্ষকও। ফুলে ফুলে ঘুরে মধুসংগ্রহ যেমন মৌমাছির ফিতরাত, তেমনি সর্বমুহূর্র্তে ও সর্বস্থলে জ্ঞানার্জন ও জ্ঞান-দানের ফিতরাত হলো প্রকৃত জ্ঞানীর। তখন জ্ঞানের সন্ধানে সাগর, মরুভুমি, পাহাড়-পর্বত অতিক্রমেও সে পিছপা হয়না। বিদ্যালয়ের কাজ সে ফিতরাতকে জাগ্রত করা। একমাত্র তখনই নর-নারীগণ জ্ঞানার্জনের মেশিনে পরিণত হয়। তখন দেশে জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রবল জোয়ার আসে।

শিক্ষকের দায়িত্ব জ্ঞানার্জনের সে ধারাকে শুধু বিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি কোনে পৌঁছে দেওয়া। তখন সমগ্র দেশ পরিণত হয় পাঠশালায়। নবীজীর আমলে সেটিই হয়েছিল। ফলে সে সময় কোন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় না থাকলেও যে হারে ও যে মাপে জ্ঞানী ব্যক্তি সৃষ্টি হয়েছিলেন মুসলিম বিশ্বের শত শত বিশ্ববিদ্যালয় আজ তা পারছে না। সে আমলে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব একজন গৃহবধু যতটুকু বুঝতেন এ আমলের প্রফেসরও তা বুঝেন না। এবং সে প্রমাণ ইতিহাসে প্রচুর। শিশু আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর মাতা জীবনের সকল সঞ্চয় শিশুপুত্রের জামার আস্তিনে বেঁধে ইরানের গিলান প্রদেশ ছেড়ে হাজার মাইল দূরের বাগদাদে পাঠিছিলেন। অথচ সে সময় আধুনিক যানবাহন ছিল না। পথে ছিল ডাকাতের ভয়, যার কবলে তিনি পড়েছিলেনও। মুসলমানগণ তাদের গৌরব কালে জ্ঞানার্জনকে কতটা গুরুত্ব দিতেন এটি হলো তারই নমুনা। অথচ আজ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জ্ঞানদানের কাজে ফাঁকি দিয়ে বিদেশি সংস্থায় কাজ করেন। মেডিকেল কলেজের প্রফেসর ভবিষ্যৎ ডাক্তার তৈরির কাজে ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে বসে অর্থ কামাই করেন। তারা নিজ সন্তানের ধর্মজ্ঞান দানে এতই উদাসীন যে, সে লক্ষ্যে হাজার মাইল দূরে দূরে থাক, পাশের অবৈতনিক মাদরাসাতেও পাঠাতে রাজি নন।

যা সকল ব্যর্থতার মূল কারণ

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেই দেশের প্রতিটি মানুষ জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানবৃদ্ধির বিরামহীন মেশিনে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে ইসলামের অর্জনটি সমগ্র মানব ইতিহাসে অভূতপূর্ব। পবিত্র কুরআনের পূর্বে আরবি ভাষায় কোন গ্রন্থ ছিল না। ছিল শুধু কিছু কবিতা ও কসীদা। ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা জ্ঞানার্জনকে ফরজে আইন তথা প্রত্যেকর ওপর বাধ্যতা মূলক ঘোষণা করে। ফলে সে ফরয পালনের তুমুল আগ্রহে অতি অল্প সময়ের মধ্যে জ্ঞানের ভূবনে মুসলিম বিশ্বে বিশাল সমৃদ্ধি আসে। ঘরে ঘরে তখন লাইব্রেরি গড়ে ওঠে। মিশর, সুদান, মরক্কো, তিউনিসা, লিবিয়া, আলিজিরিয়ার ন্যায় বহুদেশের মানুষের মাতৃভাষা আরবি ছিল না। কিন্তু জ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাণ্ডার কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ার প্রয়োজনে নিজেদের মাতৃভাষা দাফন করে আরবি ভাষাকে নিজেদের ভাষা রূপে গ্রহণ করেছেন। ফলে তার ইসলামী সভ্যতার নির্মাণে বিশাল ভূমিকা রাখতে সমর্থ হন। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা বিশাল। দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা যেমন জ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাণ্ডার পবিত্র কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়তে ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি শিক্ষককে আদর্শ শিক্ষক রূপেও গড়ে তুলতে পারেনি। তেমনি ছাত্রকেও গড়ে তুলতে পারিনি প্রকৃত ছাত্র রূপে। তারা পুরাপুরি ব্যর্থ হয়ছেন শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে। এটিই হলো বাংলাদেশের সকল ব্যর্থতার জন্মভূমি। নিছক পড়ন, লিখন বা হিসাব-নিকাশ শিখিয়ে সেরূপ গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করা যায়? এজন্য তো জরুরি হলো, ব্যক্তির বিশ্বাস ও দর্শনে হাত দেওয়া। নবীজীর (সা.) আগমনে আরবের আবহাওয়ায় পরিবর্তন আসেনি। পরিবর্তন আসেনি তাদের দৈহিক বল বা খনিজ সম্পদে। বরং বিপ্লব এসেছিল তাদের জীবন-দর্শনে। সে দর্শন পাল্টে দিয়েছিল বাঁচানোর লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও রূচীবোধ। ফলে বিপ্লব এসেছিল শিক্ষা খাতে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় লিখন, পড়ন বা হিসাব-নিকাশ গুরুত্ব পেলেও গুরুত্ব পায়নি দর্শন। ফলে জীবন পাচেছ না সঠিক দিক-নির্দেশনা। পুষ্টি পাচ্ছে না শিক্ষার্থীর বিবেক ও চেতনা। ফলে ছাত্র পাচ্ছে না সুষ্ঠ চিন্তার সামর্থ্য। অথচ জাতি আদর্শ নেতা, বুদ্ধিজীবী, সংস্কারকের সরবরাহ পায় দর্শনসমৃদ্ধ সুশিক্ষিত ব্যক্তিদের থেকে; পেশাজীবী, কর্মজীবী বা টেকনোক্রাটদের থেকে নয়। দর্শনের প্রতি অবহেলায় মানুষ নিছক নকল-নবীশে পরণিত হয়। বাংলাদেশে উন্নত বিবেকবোধ, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি বেড়ে না উঠার অন্যতম কারণ হলো এটি। তাছাড়া জ্ঞান শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, তা ছড়িয়ে আছে আসমান-জমিনের ছত্রে ছত্রে। চন্দ্র-সূর্য, গ্রহনক্ষত্রই শুধু নয়, গাছপালা, জীবজন্তু, নদীনালা, অণু-পরমাণু তথা দৃশ্য-অদৃশ্য প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে লুকিয়ে আছে জ্ঞানের উপকরণ। কুরআনেরর ভাষায় এগুলি হলো আল্লাহর আয়াত। যা পড়তে হয় শুধু চোখের আলাতে নয়, মনের আলোতেও। ইসলাম তাই আলোকিত মনের মানুষ গড়তে চায়। তখন সমগ্র বিশ্বটাই পাঠশালা মনে হয়। এ পাঠশালারই শিক্ষক ছিলেন নবীপাক (সা.)। জ্ঞান বিতরণে ও মানুষকে চিন্তাশীল করার কাজে আল্লাহর এ আয়াতগুলিকে তিনি কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছেন। সেখান থেকেই গড়ে ওঠেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানসাধকগণ। জীবনের মূল পরীক্ষায় তথা মহান আল্লাহকে খুশি করার কাজে তাঁরাই মানব-ইতিহাসে সর্বাধিক সফল হয়েছিলেন। পবিত্র কুরআনে তাঁদের নিয়ে তিনি গর্বও করেছেন। এমন কি সক্রেটিস যে পাঠশালার শিক্ষক ছিলেন সেটিও আজকের মত কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। সেটিও ছিল এথেন্সের উম্মূক্ত অলিগলি ও মাঠঘাট। অথচ জ্ঞানচর্চায় তিনিও অবিস্মরণীয় ইতিহাস গড়েছেন। জ্ঞানবিতরণে জ্ঞানকেন্দ্রের চেয়ে শিক্ষকই যে মূল সেটি তিনিও প্রমাণ করে গেছেন। অথচ আমরা বিদ্যালয় গড়ে চলেছি যোগ্য শিক্ষক না গড়েই। যা ডাক্তার না গড়ে হাসপাতাল চালানোর মত। সমাজের অযোগ্য মানুষগুলোর ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করতে গিয়ে এরিস্টটল বলতেন, ‘এটি সেখানে তথা বিদ্যালয়ে, যেখানে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।’ অথচ বাংলাদেশে সকল ব্যর্থতার কারণ খোঁজা হচ্ছে অন্যত্র। শিক্ষার বিস্তারে শিক্ষককে প্রথমে শিক্ষিত করতে হয়। শুধু জ্ঞানদাতা হলেই চলে না, প্রতিটি শিক্ষককে ছাত্রদের সামনে অনুকরণীয় মডেলও হতে হয়। এটি নিছক বাড়তি দায়িত্ব নয়, এটিই শিক্ষকের মৌলিক দায়িত্ব। ফলে যে চরিত্র নিয়ে প্রশাসনের কর্মচারি, বিচারক বা ব্যবসায়ী হওয়া যায়, শিক্ষককে তার চেয়েও উত্তম চরিত্রের অধিকারি হতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটি যথার্থভাবে হয়নি। দেশে নিদারুন কমতি হলো উপযুক্ত শিক্ষকের। শিক্ষকের যে স্থানটিতে বসেছিলেন নবীপাক (সা.) স্বয়ং নিজে, সেখানে প্রবেশ করেছে বহু নাস্তিক, পাপাচারি ও চরিত্রহীনেরা। ফলে ছাত্ররা শুধু জ্ঞানের স্বল্পতা নিয়েই বেরুচ্ছে না, বেরুচ্ছে দুর্বল চরিত্র নিয়েও।

ব্যর্থতা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বের

মডেল খাড়া করায়

ইতিহাস ঘেঁটে ছাত্রের সামনে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব বা ‘ফিগার অব হাইনেস’ তুলে ধরা শিক্ষানীতি ও শিক্ষকের অন্যতম বিশাল দায়িত্ব। মডেলকে সামনে রেখে শিল্পি যেমন ছবি আঁকে, ছাত্রও তেমনি তার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বকে সামনে রেখে স্বচেষ্ট হয় নিজেকে গড়ার। এরূপ মডেল নির্বাচনে প্রতি দেশেই নিজ নিজ ধর্মীয় চেতনা ও জাতীয় ধ্যানধারণা গুরুত্ব পায়। গরুকে দেখে যেমন ভেড়ার ছবি আঁকা যায় না, তেমনি অমুসলমান রাজনীতি বা কবি সাহত্যিক বা বুদ্ধিজীবীকে সামনে রেখে ছাত্রও নিজেকে মুসলিম রূপে গড়ে তুলতে পারে না। পাশ্চাত্য দেশে এজন্যই নিজ নিজ ইতিহাস থেকে খ্যাতিনামা বীর, ধর্মীয় নেতা, সমাজ সংস্কারক, বৈজ্ঞানিক, রাজনীতিবিদ, কবি-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের তুলে ধরে, মুসলিম ইতিহাস থেকে নয়। কিন্তু এদিক দিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং সে সাথে অপরাধ কম না।

দেশটির ভাষাভিত্তিক উগ্র জাতীয়তাবাদের ব্যর্থতা শুধু এ নয় যে, জাতীয় জীবনে উন্নয়ন উপহার দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং জাতিকে প্রচন্ডভাবে অহংকারিও করেছে। আহত ও দুর্বল করেছে প্যানইসলামি চেতনাকে। ফলে জাতীয় জীবনে গুরুত্ব হারিয়েছেন ইসলামের মহান ব্যক্তি ও বীরপুরুষগণ। ফলে ছাত্ররা হারিয়েছে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব বা ফিগার অব হাইনেসের মডেল। নিছক বাঙ্গালী হওয়ার কারণে অতিশয় দুর্বল ও সামান্য চরিত্রগুলোকে বড় করে দেখানো হয়েছে। নিছক রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে কোন কোন ব্যক্তিকে হাজার বছরের সেরা বাঙালি হিসেবেও চিত্রিত করা হয়েছে। অথচ তাদের অনেকে যেমন ছিলেন মিথ্যাচারী ও খুনি, তেমনি ছিলেন নিষ্ঠুর স্বৈরচারীও| গণতন্ত্রের নামে ভোট নিয়ে তারা চরম স্বৈরচার উপহার দিয়েছেন। ফলে চরিত্র গঠনের টার্গেট রূপে জাতি কোন উন্নত মডেলই পায়নি। ফলে ছাত্ররা কাদের অনুসরণ করবে? শূণ্যস্থান কখনই শূণ্য থাকে না, ফলে সে শূণ্যতা পূরণ করেছে কিছু দুর্বৃত্ত রাজনীতিবিদ, সন্ত্রাসী ও ব্যাভিচারি ব্যাক্তি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয়েছে সন্ত্রাস, ছিনতাই ও ব্যাভিচারির অভয় অরন্যে। এ ব্যর্থতারই বড় প্রমাণ, সেখানে ধর্ষনে সেঞ্চুরি-উৎসবও হয়েছে।

ইবাদত গণ্য হয়নি শিক্ষালাভ শিক্ষাদান

শিক্ষা-সংস্কারের লক্ষ্যে বাংলাদেশে অতীতে বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে। বহু শিক্ষা-কমিশন রিপোর্টও রচিত হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজে কিছুই হয়নি। ব্যর্থতার জন্য দায়ী স্রেফ সরকারি বা বেসরকারি দল নয়, সবাই। কারণ কারো পক্ষ থেকেই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালিত হয়নি। এ ব্যর্থতার কারণ, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ও দর্শন শিখাতেই আমরা ব্যর্থ হয়েছি। মূসলমান নামধারিরাও এটিকে ইবাদতভাবেনি। তারাও জ্ঞানার্জনকে ফরয জ্ঞান করেনি। শিক্ষকরা এটিকে যেমন উপার্জনের মাধ্যমে ভেবেছেন, তেমনি ছাত্রদের কাছে এটি পরিণত হয়েছে কোনরূপে সার্টিফিকেট লাভের উপায় রূপে। ফলে ফাঁকিবাজি হয়েছে উভয় দিক থেকেই। চিকিৎসায় ফাঁকিবাজি হলে যেমন রোগী বাঁচে না, তেমনি শিক্ষায় ফাঁকিবাজি হলে জাতি বাঁচে না। শিক্ষাক্ষেত্রের এ ব্যর্থতা থানা-পুলিশ বা আইন-আদালত দিয়ে দূর করা যায় না। তাই বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা এখন শিক্ষা সমস্যা। ভূল চিকিৎসায় কোন রোগী মারা গেলে তা নিয়ে আন্দোলন হয়। অথচ বিস্ময়ের বিষয়, ভূল শিক্ষায় সমগ্র জাতি যেখানে বিপদগ্রস্ত তা নিয়ে আন্দোলন দূরে থাক উচ্চবাচ্যও নেই। মূমূর্ষ ব্যক্তির যেমন সে সামর্থ থাকে না তেমনি অবস্থা যেন জাতিরও। আর এটি হলো নৈতিক মুমূর্ষতা।

এরূপ নাজুক অবস্থায় শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়লে চলে না। হাত দিতে হয় আরও গভীরে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মানের লক্ষ্যে শিক্ষালাভ ও শিক্ষাদানের বিষয়ে একটি পরিপূর্ণ আন্দোলনে রূপ দিতে হয়। শিক্ষা নিজেই কোন উদ্দেশ্য নয়। বরং এটি হলো একটি উদ্দেশ্যকে সফল করার মাধ্যম মাত্র। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে জানমালের বিনিয়োগের এটি হলো পবিত্র অঙ্গণ। তাই স্রেফ শিক্ষার খাতিরে শিক্ষা নয়, নিছক উপার্জন বাড়ানোর লক্ষ্যেও নয়। বরং এটি হলো, জীবনের মূল পরীক্ষায় পাশের মাধ্যম। তাই মুসলমানের জীবনে গুরুত্বপূরণ ইবাদত হলো শিক্ষাদান ও শিক্ষালাভ। শিক্ষালাভের মাধ্যমেই মানুষ হিদায়েত পায়। তাই শিক্ষা হিদায়েত লাভের মাধ্যমও। অমুসলিমদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে মুসলিমদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল পার্থক্যটি হলো বস্তুত এখানে। অথচ শিক্ষার এ মূল দর্শনটিই বাংলাদেশে আলোচিত হয়নি। গুরুত্বও পায়নি। বরং প্রভাব বিস্তার করে আছে সেক্যুলার দর্শন ও চেতনা। তাই শিক্ষা সংস্কারে কাজ শুরু করতে হবে শিক্ষার এ মূল দর্শন থেকে। কেন শিখবো, কেন শেখাবো এবং কেন এটিকে আমৃত্যু সাধনা হিসেবে বেঁছে নেব, এসব প্রশ্নের উত্তর অতি সুস্পষ্ট ও বলিষ্ঠভাবে দিতে হবে। এটি যে পেশা নয়, নেশাও নয় বরং ফরয ইবাদত সেটিও ছাত্র ও শিক্ষকের মনে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল হতে হবে। এবং সেটি বোঝাতে হবে মানব সৃষ্টির মূল-রহস্য ও দর্শনকে বোঝানোর মধ্যে দিয়ে। আলোকিত করতে হবে ব্যক্তির বিবেককে। জ্ঞান অর্জনের এ অঙ্গণে ব্যর্থ হলে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনের কোন অঙ্গণেই যে বিজয় সম্ভব নয় -সে ধারনাটিও স্পষ্টতর করতে হবে।

জীবনে মূলযুদ্ধ জয়-পরাজয়ের ভাবনা

মুমিনের জীবনে যুদ্ধ সর্বত্র। তবে দীনের বিজয়ের মূল যুদ্ধটি হয় শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানেই, অন্য যুদ্ধগুলি আসে পরে। বরং সত্যতো এটাই, সে লড়াইটি বাংলাদেশে ইতিমধ্যে শুরুও হয়ে গেছে। আরও বিপদের কারণ, এ লড়াইয়ে ইসলামের পক্ষের শক্তি লাগাতর হেরেই চলেছে। আজ থেকে ৭০ বছর পূর্বে বাঙালি মুসলিমের জীবনে যে ইসলামি চেতনা, প্যান-ইসলামিক ভাতৃত্ব ও সততা ছিল, আজ সেটি নেই। ছিল না দেশের অভ্যন্তরে চিহ্নিত বিদেশী শত্রুর এত দালাল। ফলে আজ বিধ্বস্ত হতে চলেছে বাঙালী মুসলিমদের মনবলও। দেশের সরকার সাহস হারিয়েছে এমনকি মায়ানমারের মত দেশের বিরুদ্ধে সত্য কথার বলার। ফলে দেশের ভেতরে ও বাইরে গুঞ্জন ওঠেছে স্বাধীন দেশরূপে বাংলাদেশের টিকে থাকার সামর্থ্য নিয়ে। তাই এখন চলছে নিছক টিকে থাকার লড়াই। এ লড়ায়ে হেরে গেলে হারিয়ে যেতে হবে ইতিহাস থেকে। বাঁচতে হলে এবং এ যুদ্ধে জিতলে হলে হাত দিতে হবে শিক্ষার আশু সংস্কারে। কারণ শিক্ষাঙ্গণেই নির্মিত হয় জাতির মেরুদণ্ড ও সাহসী নেতৃত্ব। সেটি শুধু সরকারিভাবে নয়, বেসরকারিভাবেও। শিক্ষাঙ্গণের এ যুদ্ধে সৈনিক হতে হবে প্রতিটি ঈমানদারকে।

[1] আল-কুরআন, সুরা আল-আ’লা, ৮৭:১

[2] আল-কুরআন, সুরা ফাতির, ৩৫:২৮

[3] আল-কুরআন, সুরা আন-নিসা, ৪:৮২

[4] আল-কুরআন, সুরা আল-বাকারা, ২:৪৪

[5] আল-কুরআন, সুরা আন-নিসা, ৪:৪৩

[6] আল-কুরআন, সুরা আল-বাকারা, ২:৪৪

[7] আল-কুরআন, সুরা আন-নিসা, ৪:৮২

[8] আল-কুরআন, সুরা আল-আনআম, ৬:৫০

PDF ফাইল…

[button link=”http://at.jamiahislamiahpatiya.com/wp-content/uploads/2019/11/November19.pdf”]ডাউনলোড করতে এখানে টাচ বা ক্লিক করুন[/button]

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ