বুধবার-৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি-২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বাস্থ্য ঠান্ডাজনিত সমস্যা

স্বাস্থ্য ঠান্ডাজনিত সমস্যা

ডা. আফরোজা আকতার

ঋতু পরিবর্তনে শীতের আগমন অবধারিত, তেমনি শীতকালে নানান স্বাস্থ্য সমস্যাও অনিবার্য। এ সমস্যাকে দূরে ঠেলে সুস্থ জীবনযাপন করতে হলে চাই বাড়তি সচেতনতা, বাড়তি সতর্কতা ও যতœ। শীতের তীব্রতায় ঠান্ডাাজনিত রোগ যেমন জ্বর, হাঁচি, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কিওলাইটিস, কনজাংটিভাইটিস, কোল্ড ডায়রিয়া, আমাশয়, খুশকি, ত্বকের সমস্যা, খোশপাঁচড়াসহ দেখা যায়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ বেশি হয়।

সাবধানতা

  • কিছু সাবধানতা এবং সাধারণ নিয়ম মেনে চললে অনেকটাই নিরাপদ থাকা সম্ভব।
  • সব সময় সুষম পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
  • প্রচুর পরিমাণে শাক-সবজি ও ফলমূল খান।
  • অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার খাবেন না।
  • দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে রোগজীবাণু প্রবেশ করে ডায়রিয়া-আমাশয় হতে পারে।
  • বাসি-পচা বা রাস্তার খোলা খাবার এড়িয়ে চলুন।
  • ফাস্টফুড সø্যাক্স এড়িয়ে চলুন।
  • বিশুদ্ধ পানি পান করুন প্রচুর পরিমাণে। প্রয়োজনে হালকা গরম পানি পান করুন।
  • কোনো নির্দিষ্ট খাবারে এলার্জি থাকলে তা পরিহার করুন।
  • ধূমপান থেকে স¤পূর্ণ বিরত থাকুন। ধূমপান শরীরের সর্ব অঙ্গের ক্ষতিসাধন করে।
  • নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস করুন, এতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।
  • অযথা চোখ কচলানো, গালে-নাকে হাত দেয়ার ফলে হাত থেকে জীবাণু সংক্রমিত হয়ে চোখ লাল হওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া, নাক দিয়ে পানি পড়া, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়াসহ নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
  • সর্দি হলে নাক পরিষ্কারের জন্য কাপড়ের রুমালের পরিবর্তে টিস্যু ব্যবহার করুন। ব্যবহারের পর টিস্যু নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলুন। আপনার চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা আপনার দায়িত্ব।

ঠাণ্ডাজনিত রোগ

১. শীতের তীব্রতায় বাড়ে ঠাণ্ডাজনিত রোগ। শীতের রোগগুলো সাধারণত ভাইরাস ও এলার্জিজনিত কারণে হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়াজনিত কারণেও কিছু রোগ হতে পারে। যদিও এসব রোগের প্রধান কারণ জীবাণু, তবু পরিবেশের তাপমাত্রার সঙ্গে এর স¤পর্ক রয়েছে। শীতকালে তাপমাত্রা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে আর্দ্রতাও কমে, যা শ্বাসনালীর স্বাভাবিক কাজ ব্যাঘাত করে ভাইরাস আক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। আরো সমস্যা হচ্ছে, দায়ী জীবাণুগুলো ধুলোবালি, আক্রান্তের হাঁচি-কাশি অথবা দৈনন্দিন খাবার বা ব্যবহার্য জিনিস থেকে শুষ্ক আবহাওয়ায় খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে।

উপসর্গ

শীতকালে সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হলে

  • শুরুতে গলাব্যথা,
  • গলায় খুশখুশে ভাব,
  • নাক শির শির করা,
  • নাক-কান বন্ধ হয়ে যাওয়া,
  • নাক দিয়ে পানি ঝরা,
  • হাঁচি, হালকা জ্বর, শুকনো কাশি,
  • পরে মাথাব্যথা, মাংসপেশিতে ব্যথা, শরীর ম্যাজম্যাজ করা,
  • চোখ জ্বালাপোড়া করা ও পানি আসা,
  • দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়।

মূলত শ্বাসতন্ত্রের ওপরের অংশের সংক্রমণে এসব উপসর্গ দেখা দেয় এবং সাধারণত ৫ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এমনিতেই ভালো হয়ে যায়।

২. হাঁপানি: শীতকালে বাড়ে হাঁপানির প্রকোপ। এ ছাড়া ঋতু পরিবর্তনের সময়গুলোতে বিশেষত শরৎ, বসন্ত ও শীতকালে বাতাসে অসংখ্য ফুলের বা ঘাসের রেণু ভেসে বেড়ায়, যা হাঁপানির উত্তেজক উপাদান হিসেবে কাজ করে।

৩. আর্থ্রাইটিস: সর্দি-কাশি ফ্লুর মতো এতটা প্রকট না হলেও আরো অনেক রোগেরই তীব্রতা বাড়ে শীতকালে। বিশেষত আর্থ্রাইটিস বা বাতের ব্যথা শীতে বেশি বাড়ে।

৪. চর্মরোগ: শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকে। শুষ্ক বাতাস ত্বক থেকে পানি শুষে নেয়। ফলে অনেকের ঠোঁট, হাত-পায়ের নখ, ত্বক শুষ্ক ও দুর্বল হয়ে ফেটে যায়। পরবর্তীকালে খোশপাঁচড়াসহ নানা চর্মরোগ দেখা দেয়। খুশকির সমস্যা বেড়ে যায়।

৫. হাইপোথার্মিয়া: তীব্র শীতে অনেকের হাতের আঙুল নীল হয়ে যায়। শীত প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে শরীরের তাপমাত্রা অতিরিক্ত কমে গিয়ে (হাইপোথার্মিয়া) মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।

চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

  • সর্দি-জ্বরের সময় বিশ্রামে থাকতে পারলে ভালো। গরম চা বা কফি খাওয়া যেতে পারে। হালকা গরম পানিতে লবণ দিয়ে গার্গল করা যেতে পারে। মধু, আদা, তুলসী পাতার রস, লেবুর রস খাওয়া যায়। এ ধরনের সমস্যায় সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন পড়ে না। জ্বর ও ব্যথানাশক এবং অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ কারো কারো লাগতে পারে। তবে অবশ্যই ওষুধ খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
  • হাঁপানি রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শমতো প্রতিরোধমূলক ইনহেলার বা অন্যান্য ওষুধ ব্যবহার করতে পারেন। রোগীর থালা, গ্লাস, রুমাল, তোয়ালে প্রভৃতি আলাদা রাখতে হবে। যেখানে-সেখানে থুথু, কফ বা শ্লেষ্মা ফেলা যাবে না।
  • ছোটখাটো সর্দি-জ্বর, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া থেকেই নিউমোনিয়া বা এ ধরনের বড় রোগ হতে পারে। তাই শিশু আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
  • ডায়রিয়া হলে স্যালাইন ও অন্য পুষ্টিকর স্বাভাবিক খাবার খাওয়ান। ছোট শিশুর ক্ষেত্রে মায়ের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করবেন না।
  • স্ক্যাবিস জাতীয় চর্মরোগ হলে পরিবারের সবার একসঙ্গে চিকিৎসার প্রয়োজন পড়তে পারে।
  • শিশুদের ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তাই শিশুকে ঠাণ্ডা আবহাওয়া থেকে দূরে রাখুন। প্রয়োজনে মাথায় সব সময় সুতি কাপড়ের স্কার্ফ বা টুপি পরিয়ে রাখুন। শিশু যাতে নিজে নিজেই পরনের কাপড় খুলে ফেলতে না পারে সেদিকে লক্ষ রাখুন। বেশি সময় খালি গায়ে রাখা হলে ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে। এ কারণে প্রস্রাব-পায়খানা বা গোসল করানোর পর শিশুদের দ্রুত গরম কাপড় পরিয়ে দিন। আক্রান্ত ব্যক্তির সং¯পর্শে শিশুকে আসতে না দেয়াই ভালো। শিশু আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ডায়রিয়া হলে স্যালাইন ও অন্যান্য পুষ্টিকর স্বাভাবিক খাবার খাওয়ান।
  • শীতকালে সচেতন থাকা আর কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলার মাধ্যমে রোগবালাই থেকে অনেকাংশেই মুক্ত থাকা যায়। যতটা সম্ভব ঠাণ্ডা বাতাস এড়িয়ে চলুন। ঠাণ্ডার সময় গরম কাপড় পরুন, এমনকি ঘরের ভেতরেও। পাকা মেঝের ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা পেতে ঘরে চটি বা ¯পঞ্জ পায়ে দিন। বাইরে গেলে অবশ্যই কানটুপি, মাফলার এবং জুতা-মোজা, হাত-মোজা ব্যবহার করুন। ঠাণ্ডা বাতাস সরাসরি যাতে শ্বাসনালীতে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন।
  • শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকে। শুষ্ক বাতাস ত্বক থেকে পানি শুষে নেয়। ফলে ত্বক শুষ্ক ও দুর্বল হয়ে ফেটে যায়। পরে খোশপাঁচড়াসহ নানা চর্মরোগ দেখা দেয়। প্রতিদিন সাবান মেখে গোসল করুন। গোসলের জন্য হালকা গরম পানি ব্যবহার করুন। সারা শরীরে ভালো কোনো তেল বা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে পারেন গোসলের পর।
  • মুখে হালকা করে লাগাতে পারেন ভালো কোনো কোল্ড ক্রিম। ঠোঁট শুকিয়ে গেলে ভ্যাসলিন, লিপজেল প্রভৃতি ব্যবহার করুন। জিভ দিয়ে বারবার ঠোঁট ভেজাবেন না। ঠোঁট শুকিয়ে গেলে শুষ্ক আবরণ টেনে তুলবেন না।
  • সংক্রমণ থেকে বাঁচতে হলে হাত ধুতে হবে বারবার। বিশেষ করে কাজ শেষে ঘরে ফেরার পর অবশ্যই ব্যাকটেরিয়ানাশক সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুতে হবে।
  • অনেককেই খাবার পর যতটা যতœ নিয়ে হাত ধুতে দেখা যায়, খাবার আগে তারা ততটা সময় নিয়ে হাত পরিষ্কার করেন না। অথচ খাবার আগে ভালোভাবে হাত ধোয়াটা খুবই জরুরি।
  • ঘর পরিষ্কার রাখুন, যাতে ধুলোবালি না জমে। চাদর, বালিশের কভার নিয়মিত পরিষ্কার করে দীর্ঘক্ষণ রোদে শুকাতে দিন। কার্পেট ব্যবহার না করাই ভালো। বিশেষত শোবার ঘরে। কারণ কার্পেটের ফাঁকে জমে থাকা ধুলো শ্বাসনালীর রোগ বাড়ায়। একই কারণে রোমযুক্ত বালিশ, চাদর, লেপ-কাঁথা ব্যবহার করা উচিত নয়।
  • দরজার বা ফ্রিজের হাতল, ফ্যান-লাইটের সুইচ, টেলিফোন, টিভির রিমোট কন্ট্রোল সংক্রমণ ছড়ানোর অন্যতম জায়গা। জীবাণুনাশক দিয়ে নিয়মিত এসব স্থান পরিষ্কার রাখুন। রান্না করার সময় ধোঁয়া যাতে ওখান থেকে বেডরুম বা ড্রইংরুমে আসতে না পারে সে জন্য রান্নাঘরের জানালা খোলা রাখুন।
  • সচেতন হোন এবং এই শীতে সুস্থ থাকুন, নিরাপদ রাখুন আপনার সন্তানকেও।
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ